বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:২৩ অপরাহ্ন

নিষিদ্ধ সম্পর্ক বনাম নারীর মর্যাদা

মেহেরুন্নেছা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২০

একটা মুভি দেখছি। হ্যান্ডসাম গৃহস্বামী পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়েন যিনি কিনা কলেজ পড়ুয়া একমাত্র ছেলে সন্তানের বাবা। পরকিয়া সংক্রান্ত মুভি বলে কথা! আমার উনি দেখি গোগ্রাসে গিলছেন। আবার আমাকেও অনুরোধ করলেন দেখার জন্য।

নিষিদ্ধ জিনিস মানুষকে টানে। আমিও যেনো কি এক অমোঘ আকর্ষণে বসে গেলাম নারী এবং পুরুষের নিষিদ্ধ দ্বিচারি ভূমিকার মনস্তাত্মিক আচার-আচরণের পাঁচ-মিশালী পটভূমি অবলোকন করতে।

যেদিন থেকে গৃহস্বামী পরকিয়ায় জড়ালেনতো সেদিন থেকে তার আর স্ত্রীকে ভালো লাগতোনা। সময়ে স্ত্রীর প্রতি আচরণ বৈরি থেকে বৈরিতর হতে লাগলো। স্ত্রী স্বামীর প্রতি যত ভালোবাসাই দেখাতো, তা স্বামীর কাছে চরম বিরক্তিকর ঠেকতো।

প্রকৃতির কি অমোঘ খেয়াল! একদিকে স্বামীর অবহেলা, মানসিক অত্যাচার; তার উপর আবার স্ত্রীর হলো ক্যান্সার। একদিন স্ত্রী মারা গেলেন। ঘটনার ক্রমধারায় পরকিয়ায় জড়িত নারীকে ভদ্রলোক বিয়ে করলেন। এই ঘরে একটি ফুটফুটে মেয়ে হলো। বিধিবাম! আবার কিনা এই মেয়েটিরও হলো ব্লাড ক্যান্সার। এমনি করে ভদ্রলোকের আগের ঘরের ছেলে সন্তানটি তার সৎমা, ক্যান্সার আক্রান্ত ফুটফুটে ছোট সৎবোনটির সাথে এক আত্মিক-মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লো।

জীবনের জরা-জীর্ণতা, ক্লেশ-কষ্টগুলো সৎমা, সৎ বোন, সৎ ভাইকে স্নেহের-ভালোবাসার- আত্মার বাঁধনে বেঁধে ফেললো। তারপরেও একসময় স্বামীপ্রবর তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে অর্থাৎ সৎমাকে তার সৎ ছেলের প্রতি মানবিক সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বিষোদগার করতে লাগলো। বাবাটির চিরাচরিত মনস্তাত্মিক সংস্কার ছিলো এই যে, সৎমা আর সৎ ছেলে কখনো সহজাত স্নেহ-ভালোবাসায় আবদ্ধ হতে পারেনা। কিন্তু সৎ মা ছিলো মানবিক। তারপরেও ছেলেটির বাবার বক্তব্য হলো– সৎ মায়ের নিজের মেয়ের ব্লাড ক্যান্সার হওয়ার কারনে সে ঠেকায় পড়ে সৎ ছেলেটির সাথে মানবিক আচরণ করছে। সাথে সাথে মুভি দেখায় রত আমার কর্তাও মুভির সেই গৃহস্বামীর সাথে সুর মিলিয়ে কথা ছাড়তে লাগলেন।

আমি বুঝাতে চাইলাম যে, পৃথিবীর মানুষগুলোর আচরণ একই সূত্রে গাঁথা নয়। আচরণে বৈচিত্র্য থাকাটা স্বাভাবিক। সুতরাং এক্ষেত্রে সৎ মায়ের যে উদারতা, মানবিকতা তা তার মহত্বের পরিচয় বহন করে।

ওমা! তিনি পট করে বলে বসলেন, পরকিয়া করে যে মহিলা একটা সংসার নষ্ট করলো সে আবার ভালো হয় কি করে?

আমি বললাম, তাই নাকি? পরকিয়া হোক আর নিষিদ্ধ প্রেম হোক; সেটার জন্য কি এই মহিলা একা দায়ী? এই পুরুষটি কি দায়ী নয়?

তিনি বললেন, মহিলাটি পুরুষটিকে প্ররোচিত করেছিলো এ সম্পর্কে জড়াতে।

আমি বললাম, পুরুষটি যদি ভালো হতো তাহলে সে কেনো এই মহিলার ফাঁদে পা দিলো?

আমার কর্তা বললেন, সুন্দরী নারীর প্রেমের ছলা-কলার কাছে পুরুষ সহজেই ধরা দেয়। নারীর পাতা বেড়াজাল এক্ষেত্রে কঠিন শক্তিশালী। পুরুষ নারীর সুরম্য আবেদনের মোহে জড়িয়ে যায়। নারীরা নৈতিকভাবে সুস্থ,সবল এবং ভালো হলে সমাজে কখনো এ ধরনের অবৈধ সম্পর্ক ঘটার সুযোগ থাকেনা। যেখানে নারীর সৌন্দর্যের করাল গ্রাস থেকে মুনি-ঋষিরা রেহাই পায় নাই; সেখানে এইসব পুরুষরাতো নারীর রূপের কাছে কোন ছার!

এভাবে তর্ক- বিতর্ক চললো বটে, কিন্তু অবশেষে তিনি পুরুষ হিসেবে তার অবস্থানেই অটল থাকলেন। রাগে-ক্ষোভে কর্তার সাথে এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ালাম না। কারন, পুরুষের ক্ষেত্রে আমি এখন পর্যন্ত একটা কথাই বিশ্বাস করি, “চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী”!

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অবশেষে আমার ঘরের পুরুষটিও সেই নারীকেই পরকিয়ার জন্য দোষারোপ করলো; যেটা আমাদের সমাজের বেশিরভাগ পুরুষই করে থাকে।

এমনকি মুভির পুরুষটিও এমনভাবে ঐ সৎমাকে তিরষ্কার করে কথা বলছিলেন যেনো পুরুষটি এই নারীকে বিয়ে করে সমাজে স্বীকৃতি দিয়ে জাতে উঠিয়েছেন।

হায়রে পুরুষ! নিজের লাম্পট্যকে স্বীকার সে কখনো করবেনা। সকল দোষ নারীর কাঁধে চাপিয়ে নিজের পৌরুষত্বের সাধুতা জাহির করে বেড়াবে। অথচ পরকিয়ায় তার সাধুতা কিংবা পৌরুষত্ব হলো পুরোটাই শুভঙ্করের ফাঁকি!

অতএব, হে নারী! সাবধান! কখনো নিষিদ্ধ সম্পর্ক নয়! এ সম্পর্কে স্বীকৃতি নেই, নিরাপত্তা নেই, সুখ নেই; মর্যাদা নেই। আছে নিন্দা, অপমান, ধিক্কার, যন্ত্রনা, নীপিড়ন। ভুল সম্পর্ক জীবনকে উত্তরোত্তর গ্লানিময় করে তুলে।

বরং নারী তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে স্বমহিমায় থাকার মাঝেই সুখ নিহিত। সুখের জন্য পরপুরুষে নির্ভরশীলতার মত বোকামি আর কিছুতেই হতে পারেনা। নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়ানোর চেয়ে একলা

জীবন কাটিয়ে দেয়া ঢের ভালো।

চলন্ত ট্রেনে সময় কাটানোর জন্য যাত্রীরা অনেক সময় বাদাম খায়। খাওয়া শেষ হলে তারা বাদামের প্যাকেট জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দেয়। আবার কেউ কেউ প্যাকেটটি ট্রেনের মেঝেতে পায়ের কাছে ফেলে রাখে।

নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়ানো নারীর দশাও ঠিক এমনি ফেলে দেওয়া বাদামের প্যাকেটের মত।

প্রয়োজন শেষে পুরুষ তাকে কোনো না কোনো সময় ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

মতামত লিখুন :

এ জাতীয় আরো খবর..

আপনি কি খুঁজছেন?

পুরোনো মাসের সংবাদ

© All rights reserved © 2019 Digital Noakhali
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbazardnoakha4